Thursday, November 12, 2020

 ট্যাঁরা চোখ

রোকনুজ্জামান রিপন

 

অনেক বসন্ত আগে একবার মরিচিকার মতন প্রেম এসেছিল আমার জীবনে সে বড় অল্পক্ষণ। কচুর পাতায় অভ্র দানার মতন রোদ উঠবার আগেই তা মিলিয়ে গেল।আমি অহর্নিশ ভেবেছি, স্বয়নে স্বপনে বহু বসন্ত তার কথা ভেবেছি। কিন্তু আর সে এলোনা। আজ যখন স্মৃতির বোঝা চাপতে চাপতে সেই স্মৃতি মলিন থেকে ধূসর হতে শুরু করেছে ঠিক তখন,বিজলি চমকের মতন আবার এসে উড়িয়ে নিয়ে গেল কালের পর্দা। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মত উলঙ্গ সেই স্মৃতি আমায় কেমন বিমোহিত করে হেসে উঠলো। আমি আবার হারিয়ে গেলাম বহু বসন্ত আগে চৈত্রের কাঠ ফাটা রৌদ্রদগ্ধ এক পল্লী গাঁয়ে।গ্রাম্য যুবতিরা কলসি কাধে জল নিতে আসে এই গাঁয়ে।তাদের নির্ঝর হাসি ভেসে বেড়ায় ইট বিছানো রাস্তায়।

আমি তখন সদ্য মাধ্যমিক টপকে কিশোরর নাম কেটে যুবক হতে শুরু করেছি।বসন্ত এলেই কেমন উদভ্রান্ত  হয়ে ওঠে দিগন্তরেখা।আকাশে বাতাসে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা নারি মূর্তি ধারন করে।আমার স্বভাব চিরকাল শিমুল ফলের বিজের মত।উপরে শক্ত খোলক দিয়ে ভেতরে তুলার আস্তরনে নিজেকে গুটিয়ে রাখা।বন্ধু ভাগ্য আমার কোন কালেই প্রসন্ন ছিলনা।সকলের সাথে পরিচয় হয়,সহপাঠী হয়,কিন্ত বন্ধু হয়ে ওঠেনা কেউ।

আমার চারপাশ জুড়ে একটা আলাদা ভুবন গড়ে উঠেছে। ক্যানভাসে সাত রঙে আমার ভুবনকে আমি রঙিন করে তুলতাম।সেদিন প্রখর রৌদ্রময় একটা দিন।ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম পুকুরপাড়ে।ক্যানভাসে উদ্দেশ্যহীন ভাবে আঁকিবুঁকি কাটছি।হটাৎ আমার কানে এলো এক মধুকর হাসির ঝংকার। যেন সাতশ নুপুরধ্বনি বেজে চলেছে ক্রমান্বয়ে আকাশ বাতাস কাপিয়ে সে সুর ভেসে চলেছে আদিগন্ত ভেদ করে। আমার হাতের তুলি মুহুর্তকাল থমকে গেল।তারপর চৈত্রের তপ্ত দুপুরবেলা উত্তরী ঠান্ডা হাওয়ার মতন এক

ঝলক দেখলাম।ফর্সা যুবতির বাঁকা চোখ।যে চোখকে গ্রাম্যদেশে ট্যাঁরা বলে উপহাস করে।কিন্ত সে ট্যাঁরা চোখ যে এমন মায়াবী হতে পারে তা এ এক দেখাতেই বুঝেছিলাম। ফর্সা চিবুকে একটা খয়েরী তিল চাঁদের কলঙ্কের মতন মাথা তুলে আছে।এক দেখাতেই ওলট পালট হয়ে গেল আমার ভূবন।সেই ট্যাঁরা চোখের মায়া এক পলক দেখলেও চোখে লেগে থাকে হাজার বসন্ত। আমার ক্যানভাসে সেই মায়া আমি ফুটিয়ে তুলি অনেক প্রেম নিয়ে।ট্যাঁরা চোখে এক সমুদ্র বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।আমার সমস্ত যৌবন এক নিমেষই এ ট্যাঁরা চোখের বাঁকা চাহুনিতে বাধা পড়ে।

তারপরে আর তারপর নেই।সকলা, দুপুর, বিকাল

আমার সেই কল পাড়ে বসেই কাটে।হাতে থাকে ক্যানভাসে আকা সেই বাকা চোখ।কিন্ত আমার প্রতিক্ষা যেন আর শেষ হয়না।দিনের পর দিন কাটে তার দেখা মেলেনা।তারপরে যে কত বসন্ত কাটলো তার হিসেব নেই।আমি খোলস মোচন করে বেরিয়ে এসেছি রাস্তায়।পরিচিত থেকে বন্ধু ও হয়ে উঠেছে অনেকে।কিন্তু সেই ট্যাঁরা চোখের দেখা আর পেলামনা। অনেক খুজেছি।একবার শুনলাম সে নাকি জেলে পাড়ার নিতাই জেলের মেয়ে।গলঘেষিয়ায় জাল ধরে।বহু বার জেলে পাড়ার রাস্তা দিয়ে গেছি। উকি দিয়ে দেখেছি।কিন্ত তার দেখা পাইনি। খুঁজতে খুঁজতে কখনো ক্লান্ত হয়ে ভাবি ভুলে যাব এই বেলা।কিন্তু সেই বাঁকা চোখের ছবিটা আমায় ভুলতে দেয়না। সেই এক পলকে দেখা চির চেনা মুখটা ক্যানভাস জুড়ে মিটি মিটি হেসে আমায় উপহাস করে।বলে,এই তোমার প্রেম।এতটুকু প্রতিক্ষায় হাপিয়ে উঠলে? 

আমি আবার ছুটে চলি।অবাধ্য নদীর মত চিরজলা সজীব সমুদ্ররের খোঁজে।

 শিল্পকলা একাডেমীতে নতুন শিল্পীদের ছবির এক্সিবিশন চলছে।বন্ধুদের অনুরোধে সেই ছবিটাও জমা দিলাম।কথা হল এক্সিবিশন শেষ হলে ছবি ফেরত পাব।এক্সিবিশনে দর্শনার্থীরা আসে, আমার ছবির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে তারপর চলে যায়।আমার মনে ক্ষীণ আশা জাগে কেউ হয়তো চিনবে।কেউ এসে বলবে আরে এ যে সে।কিন্ত কেউ সে কথা বলেনা।কেউ কেউ এসে কিনতে চায় ছবিটা। আমি না করে দেই।এক্সিবিশনের শেষ দিন,

পৌর মেয়র এলেন।সেরা ছবি নির্বাচিত করে পুরুস্কার তুলে দেবেন শিল্পীর হাতে।মেয়রের সাথে একটা আঠার-উনিশ বছরের মেয়ে এল।সুন্দরি বলতে আমরা যা বুঝি মেয়েটি তেমন নয়।গায়ের রং ময়লা।কিন্ত মেয়েটির চোখ বাঁকা।ঠিক সেই মেয়েটির মতন।যেন কেউ আমার আঁকা ছবি থেকে চোখ দুটো তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে এই মেয়ের চোখে।তার চিবুকেও একটা খয়েরি তিল।আমার চেনা জগৎ হটাৎ যেন বদলে গেল।ঘোলা চোখে তাকিয়ে রইলাম সে চেখের দিকে।

মন্চে আমার ডাক পড়ল।সেরা শিল্পীর পুরুস্কার নিতে।আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত চল্লাম সেদিকে। মেয়েটি আমায় ফিসফিসিয়ে বল্ল,খুব ভাল আঁকেন আপনি।আমার সবকিছুই অসুন্দর,কিন্ত আপনার ছবিটা দেখলে সবাই বুঝবে আমার চোখ দুটো কত সুন্দর। ছবিটা আমাকে দেবেন?

আমার ঘোলাচোখে তখন অথৈ সমুদ্র।আমি বিনাবাক্যে বাড়িয়ে দিলাম ছবিটা। আমি  ঐ বাকা চোখের ভাষা সব পড়তে পারছিলাম।আমার যে আর কিছুই চাওয়ার নেই।ওই চোখে যে এক সিন্ধু বিষাধ মিশ্রিত বিষ্ময়। 


তারপরে বহুদিন কেটেছে।সব স্মৃতি ফিকে হতে হতে ঝাপসা হয়ে উঠছে।সবকিছু যেন ভুলেই গেছি।কিন্ত প্রকৃতির বিড়ম্বনায় তা আর হয়ে উঠলোনা।বন্যায় প্লাবিত হয়ে এক বন্দি জীবন যাপন করছি।কোমর সমান পানি ডেঙিয়ে যেতে হয় বাজারে। আজ বিকাল বেলা, সূর্যটা সবে লাল হয়ে ডুবে যাচ্ছে পশ্চিম বিলের অথৈ নোনাজলে।আমি আধ ভেজা হয়ে সবে উঠেছি জেলে পাড়ার রাস্তায়।হটাৎ চোখে পড়ল সেই চেনা চোখ।ফর্সা চিবুকে খয়েরী তিল।

কিন্তু একি,ওর পরনে সাদা শাড়ি কেন! বাঁকা চোখে সেই বিস্ময় যেন আর নেই। সেখানে কেমন হতাশার ছাপ।ট্যাঁরা সে চোখে সে মায়া আর নেই,ও চেখের পাশে অনিদ্রার কালো দাগ।আমি চেয়ে রইলাম ব্যাথিত দৃষ্টিতে।

হটাৎ এক কর্কশ মহিলা কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,এই বাড়ির মধ্যি ঢোক, রাস্তায় এক মুসলিম ব্যাটায় খাড়াই আছে।বিধবার পরপুরুষ দেখতে নাই।

নগ্ন পায়ে আচল টেনে ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে।আমি ঠাঁই দাড়িয়ে দেখতে পেলাম এক ট্যাঁরা চোখের মায়াবী অশ্রু।

         (সমাপ্ত)

Wednesday, November 11, 2020

আমি তোমারে




শাহ পরান শান্ত

 মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্য তাজমহলের দিকে,

তুমি যখন তাকাবে, 

তুমি হয়তো,অভিভূত হয়ে পড়বে।

আহা!! ভালোবাসার স্মৃতি স্মারক! 

তবে আগ্রার এই অধিপতির ভালোবাসাও নিখাদ নয়।

এর পেছনেও আছে নিকষ কালো ইতিহাস! 

তবে তুমি এই ভারতদেশে আরেকজনকে পাবে।

পাহাড় থেকে পড়ে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মারা গিয়েছিল বলে,

২২ বছর ধরে নিজে একা পাহাড় কেটে করেছিলেন রাস্তা।

শুধুই তার মৃত স্ত্রীর স্মরণে।

হ্যাঁ, আমি বিহারের দশরথ মাঝির কথা বলছি।

তুমি যদি কখনো তাজমহলের চাকচিক্যের ভালোবাসায় ক্লান্ত হয়ে পড়ো,

তাহলে একবার হলেও ঘুরে যেও,

দশরথ মাঝির এই ছোট্ট গ্রামে।


যদি কোনোদিন এমন হয়,

আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই মারা যাব।

তাহলে The fault in our stars উপন্যাসের

Augustus যেমন Hazel কে নিয়ে গিয়েছিলো Amsterdam এ,

আমি তোমাকে নিয়ে যাব,

আইফেল টাওয়ারের শহর প্যারিসে 

কিংবা ইউরোপের কোনো এক In flanders field এ। 

সেখানে সমান্তরালে হাঁটব দুজন। 

আর আমাদের প্লে লিস্টে বাজবে,

Louis Armstrong এর

What a wonderful world! 


মানুষের মন এ বড় বেয়াড়া,

যদি কখনো এমন হয়, 

তোমাকে অনুভব করি না, 

হয়তো আগের মতো ভালোবাসি না।

তখন এই বিষয়টা আমি কাটিয়ে উঠব এই ছলে,

তোমাকে যতো না ভালোবেসেছি তার থেকে বেশি সম্মান করেছি।


আমি চাই জীবনের সব কিছুর চাইতে,

তুমি স্রষ্টাকে ভালোবাসো।

যখন আমিও স্রষ্টার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে যাব, 

তখন এই ভালোবাসার ত্রিভুজ সমীকরণে, আমরা একটু একটু করে এক বিন্দুতে মিলিত হবো।

তোমাকে ভালোবেসে,

হয়েছি আমি বিশ্বাসী, 

আমার সকল প্রার্থনায়,

তোমারে যে আমি চেয়েছি...



শেষ জোৎস্না

   শেষ জোৎস্না শেষ জোৎস্না রোকনুজ্জামান রিপন রচিত একটি বাংলা সায়েন্স ফিকশন ও ক্রাইম থ্রিলার বই। এটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বইবন পাবলিকেশ...